
মো, মাকছুদুর রহমান পাটোয়ারী
দৌলতখান (ভোলা) প্রতিনিধি।
ভোলার দৌলতখান—যে উপজেলা একসময় নদী, কৃষি ও শান্তশিষ্ট গ্রামীণ জীবনের জন্য পরিচিত ছিল, সেই জনপদ আজ মাদকের অন্ধকার আগ্রাসনে নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। ইয়াবা, গাঁজা, ফেন্সিডিল, বিদেশি মদ এবং দেশীয় চোলাই—সব ধরনের মাদক এখন হাতের নাগালে। স্কুল–কলেজ পড়ুয়া কিশোরদের পথচলা যেখানে ভবিষ্যতের দিকে থাকার কথা, সেখানে এখন তারা দৌড়াচ্ছে অভিশপ্ত নেশার দিকে।
মাদকের ব্যবসা নেটওয়ার্ক উপজেলা জুড়ে ছড়িয়ে।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, দৌলতখানে মাদক ব্যবসা আর ছিন্ন-ভিন্ন কয়েকজনের হাতে নেই; এটি এখন একটি সুনির্দিষ্ট নেটওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
চক্রটি তিন ভাগে পরিচালিত হয়—
আলেকজান্ডার থেকে নৌ-রুটে বড় চালান নিয়ে আসে।
স্থানীয় ডিলার ঘাট, বাঁধ, বাজারে হাতে হাতে নেশা পৌঁছে দেয়।
টোকাই-তরুণ বাহিনী খুব অল্প দামে খুচরা হিসেবে বিক্রি করে।
এই তিন স্তরের কারণে পুলিশের জন্য পুরো চক্র ধরা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীরা
শিক্ষকদের বরাতে জানা যায়—
১৪ থেকে ২২ বছর বয়সী তরুণরা বেশি জড়াচ্ছে
প্রথমে বন্ধুর চাপে বা কৌতূহলে ‘একবার চেষ্টা’
এরপর আসক্তি
তারপর টাকার জন্য চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক সহিংসতা।
অনেকেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়।
কেউ কেউ পরিবার থেকে পালিয়ে শহরে চলে যায়
স্থানীয় সমাজকর্মীরা জানিয়েছেন, গত এক বছরে কিশোর অপরাধ ৩০–৩৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যার বড় অংশই মাদকসংশ্লিষ্ট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই স্থানগুলোতেই প্রায় প্রতিদিন রাতেই মাদক লেনদেন হয়—
কলেজ রোড,টাউনহল চত্বর,পশুহাসপাতাল মোড়, মুনাফ বেপারী মোড়, লাহাড়ি জঙ্গল মোড়,
বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা,
বিএনপি বাজার, এছহাক মোর, সৈয়দপুর ৬ নং ওয়ার্ড, ভবানীপুর, চর খলিফা ইউনিয়নের কলিউদ্দিন পাটোয়ারী বাড়ির মোড়, দৌলতখান পৌরসভার একাধিক স্পট,
বিশেষত কলেজ-স্কুলের আশেপাশের এলাকাগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মেঘনা নদী: মাদক পাচারের ‘সুপার হাইওয়ে’
মাদকের সবচেয়ে বড় রুট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে
দৌলতখান–আলেকজান্ডার নৌপথ
ভবানীপুর–সৈয়দপুর–মেদুয়া চরের নির্জন ঘাট
ইঞ্জিনচালিত ট্রলার ও স্পিডবোটে রাতের অন্ধকারে চালান এসে পৌঁছায়। এরপর মাদক বিভিন্ন স্থানে মোটরসাইকেল গ্যাংয়ের মাধ্যমে উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, বড় চালান প্রায়ই নদীপথে আসে মাদক ব্যবসায়ীরা পরিত্যক্ত বন্ধ ঘাটগুলো বেছে নিয়েছে।
স্থানীয় লোকজন আরো অভিযোগ করেন মাদক ব্যবসার সাথে রাজনৈতিক নেতা কর্মীরা জড়িত। তারা ধরাছোঁয়ার বাহিরে থেকে যাচ্ছে, তাদের ছত্রছায়ায় এই মাদক ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় লোকজন আরো দাবি করেন প্রশাসন যদি কঠোর হাতে দমন করে তাহলে মাদক অনেকটাই নির্মূল করা সম্ভব। এই মাদকের ছোঁয়ায় সামাজিক ক্ষতির মাত্রা ভয়াবহ পরিবারে অশান্তি কয়েকগুণ বেড়েছে
গৃহভাঙন, মারামারি, অর্থচুরি, সড়ক নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে।
বাজার ও গণপরিবেশনে ছিনতাইয়ের ঘটনা বৃদ্ধি
স্কুলে উপস্থিতি কমে গেছে, গ্যাং কালচার বাড়ছে
একজন স্থানীয় শিক্ষক বলেন—
মাদক শুধু একটি ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না; ধ্বংস করে পুরো পরিবার, পুরো সমাজ।
দৌলতখান থানা অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জিল্লুর রহমান জানান—
মাদকবিরোধী অভিযান নিয়মিত চলছে এবং আরও জোরদার করা হয়েছে। চক্র যত শক্তিশালীই হোক, কাউকে ছাড়া দেওয়া হবে না।”
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নাম শনাক্ত করা হয়েছে এবং শিগগিরই বড় ধরনের অভিযানে নামার প্রস্তুতি চলছে।