
মোঃ শাহজাহান বাশার
বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন ধর্মীয় ঘটনা, হামলা, মতবাদের বিরোধ, বক্তৃতা-বিবৃতি ও সামাজিক আলোচনায় ঘন ঘন উঠে আসছে ‘ওয়াহাবি’ এবং ‘সালাফি’ ইস্যু। বিশেষ করে সুফি, পীর-মাশায়েখ, বাউল বা স্থানীয় লোকধারার অনুসারীদের ওপর হামলার পর এসব পরিভাষা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও আলোচনা আরও বেড়ে যায়।
যদিও এসব হামলার সঙ্গে কারা জড়িত—এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনও কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়নি। ফলে ওয়াহাবি বা সালাফি মতাদর্শের অনুসারীরা এসব ঘটনায় কোনোভাবে জড়িত কি না, নাকি এগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের ঘটনা—সে বিষয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
গত এক দশক ধরে রাজধানী থেকে শুরু করে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের অনেক মসজিদের জুমার বয়ানে মতবাদের বিভাজন দৃশ্যমান হয়েছে। কোনো কোনো ইমাম বয়ানে ওয়াহাবিদের সমালোচনা করছেন, আবার কোনো ইমাম সালাফি মতাদর্শের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। এতে সাধারণ মানুষের ভেতর একটি বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে—আসলে কারা ওয়াহাবি, কারা সালাফি, আর কারা ঐতিহ্যগত সুন্নি?
ধর্মীয় গবেষকদের মতে—ওয়াহাবি মতবাদ ১৮শ শতকের আরব অঞ্চলে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওহাবের দাওয়াত থেকে উদ্ভূত। এই ধারার অনুসারীরা ইসলামের মূল চেতনা ও তাওহিদের বিশুদ্ধ ব্যাখ্যার ওপর জোর দেন।সালাফি মতবাদ মূলত নবী (সা.)-এর যুগের মুসলমানদের—‘সালাফুস সালেহীন’-এর পন্থা অনুসরণের পক্ষপাতী একটি বৃহত্তর চিন্তাধারা। সালাফি ধারার সবাই যে ওয়াহাবি—তা নয়, যদিও দুটির মধ্যে কিছু মিল রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ওয়াহাবি’ একটি নির্দিষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক ধারার নাম হলেও ‘সালাফি’ বৃহত্তর একটি আন্দোলন বা দৃষ্টিভঙ্গি, যার মধ্যে বিভিন্ন উপদল ও ব্যাখ্যা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে কয়েকটি কারণ উল্লেখযোগ্য—সাম্প্রতিক হামলা ও উগ্রতা–সম্পর্কিত আলোচনা
কয়েকটি হামলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ওয়াহাবি-সালাফি’ শব্দদ্বয় ব্যাপকভাবে ব্যবহার হতে থাকে। মসজিদভিত্তিক বয়ানে মতভেদ বৃদ্ধি ভিন্নমতের ইমামরা ওয়াহাবি বা সালাফিদের সমালোচনা করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে কৌতূহল ও বিভ্রান্তি বাড়ে। সুফি ঐতিহ্যের দেশে নতুন প্রবাহ বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে অনুসৃত সুফি-তরিকা, পীর-মাশায়েখ প্রভাবিত ধারার সঙ্গে মতাদর্শগত পার্থক্যের কারণে এই আলোচনার প্রসার ঘটে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্মীয় বিতর্কের বিস্তার
ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বক্তাদের মধ্যে মতাদর্শগত পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সাধারণ মানুষের মাঝে বিষয়টিকে আরও আলোচিত করে তোলে।
গবেষকদের মতে—ওয়াহাবি ও সালাফি মতাদর্শের মধ্যে মিল থাকলেও এরা অভিন্ন নয়। সালাফিবাদের মধ্যে একাধিক প্রবাহ রয়েছে—কেউ রাজনৈতিকভাবে নিস্পৃহ, কেউ দাওয়াতি, আবার কেউ রাজনৈতিক ইসলামের ধারায় বিশ্বাসী। অন্যদিকে ওয়াহাবি ধারা সৌদি আরবের ঐতিহাসিক ভূমিকা ও নির্দিষ্ট ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ।
এসব নিয়ে সরকার বা ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে কোনো নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা বা ব্যাখ্যা না থাকায় মানুষের মধ্যে প্রশ্ন থেকেই গেছে—ওয়াহাবি ও সালাফি কি হুমকি, নাকি কেবল মতবাদের ভিন্নতা? জুমার বয়ানে এসব নিয়ে বিভক্তি কেন দেখা যায়? সাম্প্রতিক হামলার সঙ্গে এদের কোনো বাস্তব যোগসূত্র আছে কি?
এ বিষয়ে ধর্মবিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন—ধর্মীয় মতাদর্শ নিয়ে বিভ্রান্তির সুযোগে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো লাভবান হতে পারে। তাই সরকারের পাশাপাশি আলেম-উলামাদের উচিত স্পষ্ট ও সংযত ব্যাখ্যা প্রদান।